সংবাদমাধ্যমে কথা বলতে আগাম অনুমতি লাগবে কর্মকর্তাদের

সরকারি কর্মকর্তাদের সংবাদমাধ্যমে কথা বলার আগাম অনুমতির বিধানে বিপাকে পড়ছেন সাংবাদিকেরা৷ তারা প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিক সময়ে পাচ্ছেন না৷ আবার এই আদেশকে ব্যবহার করে তথ্য গোপনেরও অভিযোগ উঠেছে৷ খবর ডয়চে ভেলের।

সরকারি কর্মকর্তারা বিভাগীয় প্রধানের অনুমতি ছাড়া সংবাদমাধ্যমের সাথে কথা বলতে পারবেন না৷ সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও মতামত দিতে পারবেন না৷ টেলিভিশন টকশো বা আলোচনায়ও অংশ নিতে পারবেন না৷১৮ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের এনিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে, যা এরই মধ্যে মাঠ প্রশাসনে চলে গেছে৷ আর এখানে বিভাগীয় প্রধান বলতে মন্ত্রণালয়ের সচিবদের বোঝানো হয়েছে বলে ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন৷

এরই মধ্যে সরকারি এই প্রজ্ঞাপনের ফল পেতে শুরু করেছেন সাংবাদিকেরা৷ বিশেষ করে যারা তৃণমূলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কাজ করেন তাদের সমস্যা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি৷ একটি জাতীয় দৈনিকের পিরোজপুরের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিনিধি দেবদাস মজুমদার জানান, ‘‘এখন তথ্য চাইলে বা কোনো বক্তব্য চাইলে সরকারি কর্মকর্তারা সরকারি প্রজ্ঞাপনটি দেখিয়ে দেন৷ তাদের সবার টেবিলেই এখন প্রজ্ঞাপনটি রাখা আছে৷’’ তিনি তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘‘একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে করোনা নিয়ে মন্তব্য চাইলে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে যেতে বলেন৷ তার কাছে গেলে প্রজ্ঞাপন দেখিয়ে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান৷ পরে অবশ্য অনুমতি নিয়ে তিনি তথ্য ও বক্তব্য দেন৷’’

তৃণমূলের সাংবাদিকদের কথা, এখন খবর দিতে হয় তাৎক্ষণিক৷ কিন্তু ওই প্রজ্ঞাপনের কারণে সঠিক সময় তথ্য পাওয়া যায় না৷ কোনো ঘটনার সরকারি পক্ষের বক্তব্যও পাওয়া যায়না৷ যদি অনুমতি নিয়ে তারা দেনও ততক্ষণে প্রতিবেদন ছাপা হয়ে যায়৷

দেবদাস বলেন, ‘‘স্পর্শকাতর ঘটনা এবং কখনো কখনো তথ্য গোপন করতে এখন সরকারি কর্মকর্তারা প্রজ্ঞাপনটিকে এখন ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন৷’’

সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদকরাও মনে করছেন সরকারের এই আদেশ সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহ করা ও কোনো একটি বিষয় যাচাই বাছাই করতে বাধার মুখে ফেলছে৷ এটা তথ্য অধিকার আইনের পরিপন্থি৷ তথ্য অধিকার আইনে বলা হয়েছে রাষ্ট্র বা সরকার কোনো তথ্য প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করবে না৷ কিন্তু এই আদেশের ফলে তথ্য প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে৷

সিনিয়র সাংবাদিক এবং টিভি টুডে’র প্রধান সম্পাদক মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, ‘‘তারচেয়েও বড় কথা হলো আমরা পিছনের দিকে হাঁটছি৷ এই আইন ও বিধিগুলো ঔপনিবেশিক আমলের৷ তথ্যের গতি রোধ করার জন্যই এগুলো করা হয়েছিলো৷ সেগুলোই চলছিলো এবং আমলারা জনবিচ্ছিন্ন ছিলেন৷ কিন্তু তথ্য অধিকার আইন করে বলা হয় রাষ্ট্র কখনো তথ্য নিয়ন্ত্রণ করবে না৷ অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করবে৷ তাই নতুন এই আদেশ তথ্য অধিকার আইনের সাথে সাংঘর্ষিক৷’’

তিনি বলেন, ‘‘প্রিন্ট সংবাদপত্রের জন্য হয়তো দুই-তিন ঘণ্টা দেরি করা সম্ভব ৷ কিন্তু টেলিভিশন এবং অনলাইনের খবর এখন তাৎক্ষণিক৷ এখন সাংবাদিকরা তথ্য চাইবেন আর কর্মকর্তারা অনুমতির জন্য অপেক্ষা করবেন৷ তাহলে তো তাৎক্ষণিক তথ্য প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবেই৷ এটা নেতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি করবে৷’’

তবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘‘এই আদেশে সাংবাদিকদের জন্য তথ্য পাওয়ায় কোনো সমস্যা হবেনা৷ তাদের তথ্য বাধাগ্রস্ত করাও এর উদ্দেশ্য নয়৷ উদ্দেশ্য হলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সঠিক তথ্য দেয়৷ এখন যা হচ্ছে, যার যা বলার কথা নয় তিনি তা বলছেন৷ কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর তথ্যও দেয়া হচ্ছে৷ আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত দিয়ে নানা সমস্যার সৃষ্টি করছেন কেউ কেউ৷’’

তিনি জানান, এটা নতুন কোনো আদেশ বা আইন নয় পুরনো আইনটিকেই প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আবার মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে৷ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার ২২ নাম্বার বিধি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে৷ তবে সৃষ্টিশীল কোনো কাজের জন্য বিভাগীয় প্রধানদের কোনো আগাম অনুমোদন লাগবে না৷

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘‘আপনারা দেখেছেন একজন কর্মকর্তা ফেসবুকে বলেছেন, তাকে ১০ জন সৎ কর্মকর্তা দিলে সবকিছু ঠিক করে ফেলতে পারবেন৷ তারই তো হাজার হাজার কলিগ আছে৷ তাহলে বিষয়টি কেমন হলো? তিনি তো রাজনীতিবিদ না৷ অনেক কিছু বলা যায়৷ কিন্তু সেটা কে বলতে পারেন তা বুঝতে হবে৷ আর টকশোর প্রশ্নগুলোই তো একটু জটিল৷’’

তথ্য অধিকার আইন অনুয়ায়ী সাংবাদিকরা প্রয়োজনীয় তথ্য পাবেন৷ কোনো বাধা নেই৷ কিন্তু সরকাারি কর্মকর্তারা আচরণবিধি না মানলে আইনে লঘু ও গুরু শাস্তির বিধান আছে বলে জানান তিনি৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *